উদ্ভাবনীজানা-অজানা

নিকোলা টেসলা: শতবাঁধা অতিক্রমকারী আশ্চর্যময় এক বিজ্ঞানীর গল্প

তাঁর আবিষ্কার ব্যাতিত আধুনিক পৃথিবী কল্পনা যেত না!

আপনারা প্রায় সকলেই হয়ত ইলোন মাস্ক এর টেসলা (Tesla ) মোটরস এর নাম শুনেছেন । আজ আমরা ইলোন মাস্ক সম্পর্কে নয় সেই মানুষ সম্পর্কে জানব যার থেকে এই টেসলা মোটরস নামকরণ হয়েছে । তার সম্পূর্ণ নাম নিকোলা টেসলা । নিকোলা টেসলা মধ্যম বিজ্ঞানীদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত । তিনি এমন একটি আবিস্কার করেন যা না করলে হয়ত আজকের এই আধুনিক পৃথিবী কল্পনা করা যেত না । তিনি তার জীবনে এমন অনেক কিছুই করেন যা অদ্বিতীয় । এসবের কারণেই মানুষ তাকে রহস্যময় বিজ্ঞানী মনে করেন ।

টেসলার চিন্তাধারা এবং আবিষ্কার তার সময় থেকে অনেক সামনে ছিল । নিকোলা টেসলার জন্ম ১০ জুলাই ১৮৫৬ সালে ক্রোয়েশিয়ার গ্রাম সিমিলযানে হয়েছিল । যা তখন অস্ট্রিন সাম্রায্যের একটি অংশ ছিল । নিকোলা টেসলা ছোটবেলা থেকেই তীক্ষ্ণ মেধাসম্পন্ন ছিলেন যা দ্বারা তার প্রতি শিক্ষকরা প্রভাবিত হতো । সে মনে মনে হিসেব করাতে অনেক দক্ষ ছিল যে সে সম্পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে বীজগণিতের সমাধান মনে মনে করে ফেলতেন । যার কারণে তার শিক্ষকেরা মনে করত যে সে কোন অসৎ উপায় অবলম্বন করছে । নিকোলা টেসলার বাবা একজন পাদ্রী ছিলেন এবং তিনি টেসলাকে তার মতো পাদ্রী বানাতে চেয়েছিলেন । সে সময় ইউরোপে শিশুদের ২টি ভবিষ্যৎ ছিল, হয় পাদ্রী হতে হবে তাছাড়া সৈন্য হতে হবে । টেসলার এই ২টি তে কোন আগ্রহ ছিলনা ।

টেসলা একদিন ছোটবেলায় স্বপ্ন দেখলেন যে তিনি আমেরিকায় গিয়ে নায়াগ্রা জলপ্রপাত থেকে বিদ্যুৎ উৎপন্ন করছেন । নিকোলা টেসলার বিদ্যুৎ এর প্রতি তীব্র আকর্ষণ ছিল । এটি দেখে টেসলার বাবা তাকে অষ্ট্রিয়ার সবচেয়ে ভাল প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় গ্রাজে ভর্তি করায় । এখানে তিনি মাইকেল ফ্যারাডের ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ইন্ডাকশন সিদ্ধান্তের ওপর গভীরভাবে অধ্যয়ন করেন । তিনি মাইকেল ফ্যারাডের সিদ্ধান্তের সংশোধন করেন এবং তার শিক্ষকদের সাথে একান্তর বিদ্যুৎ ব্যাবহারের কথা বলেন, কিন্তু শিক্ষকরা তার অপমান করেন এবং তাকে নিয়ে মজা করেন ।

১৮৮০ সালে সেন্ট্রাল টেলিগ্রাফ অফিসে চাকরি পান নিকোলা টেসলা । তখন আমেরিকাতে লাইট বাল্ব আবিষ্কার করা টমাস এডিসন ডাইরেক্ট কারেন্ট এর ডিজাইন বাস্তবায়ন করে আমেরিকায় শিল্পবিপ্লব করতে চাচ্ছিলেন । নিউইয়র্ক এ নিজের প্রথম ডাইরেক্ট কারেন্ট নির্ভরশীল পাওয়ার বেস আগেই সেট করেছিলেন । দুনিয়ার জন্য ইলেক্ট্রিসিটি তখনও জাদুর মতো এবং রহস্যতেই ছিল । জায়গায় জায়গায় শট সার্কিটের কারণে আগুন এবং জীবদের ইলেকট্রিক শক লাগার কারণে মানুষদের মধ্যে বিদ্যুৎ সম্পর্কে ভয়ংকর ধারণা ছিল । নিকোলা টেসলা নিজের আল্ট্রানেট কারেন্ট সম্পর্কে টমাস এডিসনকে জানাতে অনেক আগ্রহী ছিলেন ।

১৮৮৪ সালে এক ভয়ঙ্কর সামুদ্রিক যাত্রা করে অল্পের জন্য জীবন রক্ষা করে যখন নিকোলা টেসলা নিউইয়র্ক পৌঁছেন তখন তার পকেটে মাত্র ৪ সেন্ট এবং একটি সুপারিশ পত্র ছিল যেটি চালস পাচলার তাকে দিয়েছিল । সেখানে লেখা ছিল আমার বন্ধু এডিসন আমি শুধু ২ জন মহান মানুষকে চিনি তার মধ্যে তুমি একজন এবং আরেকজন হল নিকোলা টেসলা। 

টমাস এডিসন যেই ডিসি সিস্টেম ডিজাইন করেছিলেন সেটি বাল্ব এবং মোটর চালানোর জন্য উপযুক্ত হলেও বেশি শক্তি উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছিল না । এই সমস্যার সমাধান করার জন্য এবং নিজের ডিসি ডিজাইন এ সমাধানের জন্য নিকোলা টেসলাকে কাজে রাখলেন । এ কাজে সফল হলে তেসলাকে ৫০ হাজার ডলার দেওয়ার ওয়াদা করেন । ঐ সময় এই মূল্য অনেক বেশি ছিল । নিকোলা টেসলা এডিসন এর ডিসি ডিজাইন এ কাজ করা শুরু করেন । বিশ্বাস করা কঠিন যে , তেসলা সকাল ১০ টা থেকে পরের দিন সকাল ৫ টা পর্যন্ত প্রতিদিন কাজ করতেন । প্রতিদিন প্রায় ১৬ ঘন্টা কাজ করতেন । যখন টেসলা তার কাজ সফলতার সাথে পূর্ণ করলেন এবং এডিসিন এর কাছে গেলেন, এডিসন আশ্চর্য হলেন যে টেসলা কিভাবে এতো বড় সমস্যার সহজে সমাধান করে দিলেন । কিন্তু এডিসন টেসলাকে দেওয়া ওয়াদা পূরণ করেন নি । সে টেসলাকে মাত্র কিছু ডলার দেন । নিকোলা টেসলা তখনই ওখান থেকে চলে যান ।

এরপর টেসলা তাঁর অল্টারনেটিভ কারেন্ট এর উপর কাজ করতে চেয়েছিলেন । তিনি একদল বিনিয়োগকারীদের সাথে মিলে লিবার্টি স্ট্রিট এ নিজের ল্যাব খোলেন । ৭ বছর আগে দেখা স্বপ্ন তিনি এই ল্যাব এ পুরণ করেন । এর সাথে সকল উপাদান যা এসি সিস্টেম এ কাজে লাগতো , যা এখন ও ব্যবহার করা হচ্ছে এই ল্যাব এই আবিষ্কৃত হয়েছিল । এই বছর তিনি ২২টি আবিষ্কার করেন যা এসি সিস্টেম এর ভিত্তি ছিল । তৎকালীন এক কোম্পানি তার আবিষ্কার করা জিনিস এর মূল্য বুঝতে পারে এবং তার সকল আবিষ্কার ১ মিলিয়ন ডলার এ কিনতে চায় । টেসলা এতে রাজি হয় ।

টেসলার সফলতায় এডিসন ঈর্ষান্বিত হয় এবং এডিসন ও টেসলার মধ্যে কারেন্ট এর শত্রুতা শুরু হয়ে যায় । এডিসন টেসলার বিরুদ্ধে মিথ্যে কাহিনী বানানোর চেস্টা করে । তিনি এসি সিস্টেমকে খুবই ভয়ঙ্কর বলেন । এডিসন মানুষের মধ্যে গিয়ে জন্তুর ওপর এসি কারেন্ট এর প্রয়োগ করে ফলে লোকজন এসি কারেন্ট নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন করা শুরু করেন । ফলে টেসলার নাম খারাপ হয় । এডিসন ফাঁসির বদলে কয়েদিদের এসি কারেন্ট দিয়ে মেরে ফেলা শুরু করেন ।

ছোটবেলায় দেখা স্বপ্ন তেসলা ১৮৯৬ সালে পূরণ করেন । নায়াগ্রার শক্তির ব্যবহার করে তিনি একটি বিশাল ইলেকট্রিক মোটর ও জেনারেটর নায়াগ্রা ফলে সেট করেন । টেসলার এসি ডিজাইন এর জন্য আমেরিকার জায়গায় জায়গায় ঘর আলোকিত হলো । এই বিদ্যুৎ তারের সাহায্যে লম্বা দূরতে মানুষের ঘরে যেতে লাগল । কারেন্ট এর এই লড়াইতে টেসলা এডিসনকে হার মানায় দেয় । নিকোলা টেসলা সারাজীবনেও বিয়ে করেন নি । কারণ নিকোলা টেসলার মন শুধু নতুন নতুন আবিস্কারেই ছিল ।

( নায়াগ্রা ফলসে টেসলা এর স্মরণে স্ট্যাচু )  

১৮৯৮ সালে টেসলা তার ল্যাব এ একটি অসাধারণ প্রয়োগ করেন অস্কিলেটর যন্ত্র যেটি বিদ্যুৎ জেনারেটর করতো , বলা হয় এই মেশিন এ এতো ভয়ঙ্কর শক্তি উৎপন্ন হয় যা ল্যাব এর বিল্ডিং এর কাঁচ ভেঙে ফেলেন এবং আশেপাশের বিল্ডিং এর ও ক্ষতি করেন । এই মেশিনটি বন্ধ করতে মানুষজন পুলিশ ডাকে এবং পুলিশ হাতুড়ি দিয়ে সেই মেশিনটি বন্ধ করেন ।

এরপর টেসলা এমন একটি আবিষ্কার করেন যা তার সময় থেকে ১০০ বছর আগে ছিল । ১৮৯৮ সালে টেসলা একটি ছোট নৌকা তৈরি করেন যা রেডিও কন্ট্রোল এর মাধ্যমে চলত । মানুষ এটি দেখে এতো অবাক হয় যে কারও বিশ্বাস এ হয়না । মানুষ মনে করে হয় টেসলা কোন যাদু ব্যাবহার করছে অথবা নৌকার মধ্যে কোন প্রাণী আছে । টেসলা তার নৌকা খুলে মানুষকে দেখায় যে ভিতরে কোন প্রাণী নেই । ১৯০০ সালে নিকোলা এমন বিষয়ে কাজ করতে চেয়েছিলেন যে বিনা তারে বিদ্যুৎ প্রেরণ করা । তবে এতে কেউ কোন উৎসাহ প্রদান করেনি ।

১৯২৩ সালে খবর পাওয়া যায় যে টেসলা এমন একটি মেশিন আবিষ্কার করেন যার নাম ডেথ রে । এই মেশিনটি ২০০ কিমি দূর পর্যন্ত ১০০০০ উড়োজাহাজকে একবারে নষ্ট করে দিতে পারতো । কেউ কেউ মনে করেন এটি শুধু একটি কল্পনা ছিল ।

নিকোলা টেসলার এসব আবিস্কারের জন্য মানুষ তাকে রহস্যময় মনে করতেন । তার নামে ২৭৮ টি আবিষ্কার রয়েছে । এর মধ্যে এমন অনেক আবিষ্কার ছিল যা তার সময় থেকে অনেক ভবিষ্যতমুখী । এজন্য অনেকে মনে করতেন টেসলা সময় পাড়ি দিতে পেরেছিলেন । ১৯৪২ সালে এই মহান আবিস্কারক হোটেল নিউইয়র্ক এ নিজের শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন । আমেরিকায় প্রতি বছর ১০ জুলাই নিকোলা টেসলা দিবস হিসেবে পালন করে ।

ট্যাগ গুলিঃ

এরকম আরও আর্টিকেল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close